‘পেট আছে দেইখা এতকিছু, নাইলে কিসের কষ্ট’

রুদ্রবার্তা২৪.নেট: ‘সরকার আমাগো খারাপ চায় তা কই নাই। আমরাও লকডাউন মানতে চাই। কিন্তু আমাগো করার কী আছে? একদিন কাম না করলে ঘরে চুলা জ্বলে না। ঘরে পাঁচজন খাওয়ার আছে। সরকার কয় ঘরে বইসা থাকো, তাইলে খাবো কী? খাওনের নাম নাই, হুদাহুদি লকডাউন!’
সর্বাত্মক লকডাউনের দ্বিতীয় দিন বৃহস্পতিবার (১৫ এপ্রিল) দুপুরে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় কথাগুলো বলছিলেন ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক মোহাম্মদ ফজল। লকডাউন অমান্য করে রাস্তায় বের হওয়ায় পুলিশ তার রিকশাটি আটক করে। সরকারি নির্দেশনা অমান্য করায় জরিমানা না দিলে আটক গাড়ি ছাড়া হবে না।
তপ্ত রোদে গলায় ঝোলানো গামছা দিয়ে মুখের ঘাম মুছতে মুছতে ফজল বলেন, ‘এইযে জরিমানার লাইগা ধরছে। এই টাকা আমি কই পাবো? মহাজন তো আর দিবো না। চুরি-ডাকাতি-ধার-দেনা যাই কইরা হোক এই ট্যাকা আমারই দিতে অইবো। আমার বউ বাচ্চা না খাইয়া থাকবো আর হেরা এসি রুমে বইয়া খালি কইবো লকডাউন আর লকডাউন। আমাগো দেখার কেউ নাই।’
চাষাঢ়ায় নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে ফজলের মতোই অন্তত ১৫ জন জড়ো হন। তাদের সকলের গাড়িই আটক করেছে পুলিশ। কারও প্যাডেলের রিকশা কারও আবার ব্যাটারিচালিত রিকশা। কারও আটক হয়েছে ‘মিশুক’ বলে পরিচিত ব্যাটারিচালিত বিশেষ ধরনের রিকশা। তাদেরই একজন গলাচিপা বেকারির মোড়ের বাসিন্দা মাসুদ। তার রিকশাটিও তখন পুলিশের জিম্মায়। মাসুদ বলেন, ‘পেটের তাগিদে বের হইছি দেইখা আমরা কী মানুষ না? আমাগোরে ধইরা ধইরা জরিমানা করতেছে। পেট আছে দেইখা এতকিছু করি, নাইলে কিসের কষ্ট। লকডাউনে এক সেকেন্ডের জন্যও বাইর হইতাম না যদি ঘরে খাওন থাকতো।’
সকালে বের হয়ে দুপুর পর্যন্ত রোজগার হয়েছে দুইশো’ টাকা। অথচ তাকে জরিমানা করা হয়েছে ১৫শ’ টাকা। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে মাসুদ বলেন, ‘আমাদের কারণেই দেশ চলে অথচ আমাদেরই আবার জরিমানা করতেছে। সারাদিনে দুইশো’ টাকার কাজ করতে পারি নাই কিন্তু জরিমানা কইরা থুইছে ১৫শ’। এই টাকা কইত্থেইকা দিবো? নিজের বউ-পোলাপানরে খাওয়ামু, নিজে খামু নাকি জরিমানা দিমু? কিছুই বুঝতে পারতাছি না। হাতে-পায়ে ধরছি আর লাঠি লইয়া দৌড়ানি দিছে।’
মুন্সিগঞ্জ সদরের বাসিন্দা হৃদয় থাকেন ফতুল্লার ইসদাইর বুড়ির দোকান এলাকায়। তার রিকশাও আটক করেছিল পুলিশ। অনেক মিনতি করে ছাড়িয়ে আনতে পেরেছেন তিনি। গাড়ি নিয়ে যাওয়ার সময় বলেন, শহরের ভেতর পেসেঞ্জার নিয়ে আর ঢুকবেন না। তবে পুলিশের কাছে আটক রয়েছে মোসাদ্দেকের প্যাডেলের রিকশাটি। তিনি বলেন, ‘গাড়িতে প্যাসেঞ্জার ছিল, তাগোরে টাইনা নামাইয়া দিয়া গাড়ি লইয়া গ্যাছে গা। জরিমানা না দিলে গাড়ি ডাম্পিং কইরা দিবো বইলা কয়। কী করমু বুঝতাছি না।’
বিকেলে জেলা ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক (টিআই) কামরুল বেগ বলেন, লকডাউন চলাকালীন জরুরি প্রয়োজনে এবং পণ্যবাহী যানবাহন ছাড়া সকল রিকশা চলাচলে নিষেধ রয়েছে। লকডাউন অমান্য করে সড়কে নামায় সারাদিনে সাতাশটির মতো রিকশা-ইজিবাইক-সিএনজি আটক করা হয়েছিল। তাদের মোট বিশ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ট্রাফিক আইন অনুযায়ী জরিমানা করার পর সেগুলো আবার ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

Please follow and like us: