নবীনগরে ৬ মাসে ১০ হত্যাকাণ্ড ও একাধিক ধর্ষণ!

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেই চলেছে। সর্বশেষ মারামারির ঘটনায় আহত জয়নালের মৃত্যুর মাত্র দুদিন পর অন্য একটি মারামারির ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হানিফ মিয়াও মঙ্গলবার মারা যাওয়ায় জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে।

এ নিয়ে নবীনগরে গত ছয় মাসে ১০টি খুনের ঘটনা ঘটল।

এছাড়া একই সময়ে একাধিক ধর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে। একের পর এক এসব খুন ও ধর্ষণের ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের ভাবমূর্তি দেশে ও বিদেশে নানাভাবে ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ হচ্ছে বলে বিভিন্ন মহলে এখন জোরেসোরেই আলোচনা চলছে।

পুলিশ ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের প্রথম দিনেই (পহেলা জানুয়ারি) সদরে জাহিদুল ইসলাম সানি মাত্র এক হাজার টাকার জন্য খুন হন। এরপর সদরে বাবার কাছে টাকা চেয়ে না পেয়ে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি নিজের ছেলের হাতে আলমগীর হোসেন নামে এক অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য খুন হন। এর মাত্র ১০ দিনের মাথায় ২৪ ফেব্রুয়ারি উপজেলার সলিমগঞ্জে এক মাদরাসা ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যা করে সন্ত্রাসীরা।

এ ঘটনার রেশ না কাটতেই ৫ মার্চ গোসাইপুর গ্রামে জুয়া খেলাকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের হাতে হেকিম মিয়া নিহত হন। এর কিছুদিন পর ১৬ মার্চ সলিমগঞ্জের নিলখীতে আকলিমা বেগমকে পরকীয়ার জের ধরে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

তবে এ সময়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে শিরোনাম হওয়া সবচেয়ে আলোচিত হত্যাকাণ্ডটি ঘটে উপজেলার থানাকান্দি গ্রামে। সেখানে গত ১২ এপ্রিল করোনার দুঃসময়েও দুই দলের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলাকালে প্রতিপক্ষের লোকজন মোবারক মিয়া নামের এক রিকশাচালকের দেহ থেকে তার ‘পা’ আলাদা করে সেই খণ্ডিত পা হাতে নিয়ে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দিয়ে গ্রামে আনন্দ মিছিল করে। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোবারক মারা যান।

এ ঘটনায় এখনো পা কেটে নেওয়া সেই সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

এদিকে গত ১৫ মে উপজেলার বাড্ডা গ্রামে জাহাঙ্গীর আলম নামের এক ধণাঢ্য ব্যবসায়ীকে বিলে কুপিয়ে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এরপর ২২ জুন শ্রীরামপুর বিল থেকে শিরিন আক্তার নামে এক গৃহবধূর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এর মাত্র এক দিন পর ২৩ জুন লাউর ফতেপুর গ্রামে তুচ্ছ ঘটনায় প্রকাশ্যে জয়নাল মিয়াকে কুপিয়ে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। সর্বশেষ গত ৩ জুন শ্যামগ্রামের সাহেবনগরে দুই দলের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হানিফ মিয়া গতকাল চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

এছাড়া সাম্প্রতিকালে উপজেলার থানাকান্দি, গৌরনগর, সাহেবনগর, বাজেবিশারা, উরখুলিয়া, লাউর ফতেপুরসহ বিভিন্ন গ্রামে আধিপত্য নিয়ে একাধিক সংঘর্ষের ঘটনায় অসংখ্য বাড়িঘরে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এতে বহু লোক নিঃস্ব হয়ে পড়ে। পাশাপশি সম্প্রতি সদরের কলেজ পাড়া, বড়াইল ও বড়িকান্দির গণিশাহ মাজারে একাধিক ধর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে।

তবে নবীনগরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটে উপজেলা সদরে গত ১২ মে। সেদিন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা উপজেলা সদরের ধণাঢ্য ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলামের কাছে ১৫ লাখ টাকা চাঁদা চেয়ে না পেয়ে প্রকাশ্যে তাকে লক্ষ করে গুলি ছোঁড়ে। এ ঘটনার দুদিন পর পুলিশ স্থানীয় এক সাংবাদিকের ভাইয়ের ঘর থেকে ৪৭ রাউন্ড গুলি ও সেই অস্ত্রটি (পিস্তল) উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও মূল অপরাধী এখনও ধরা ছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছে। তবে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। কিন্তু মূল আসামি এখনও গ্রেপ্তার না হওয়ায় পুরো শহরে এখনও ব্যবসায়ীদের মাঝে চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে।

এ বিষয়ে বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী এ প্রতিনিধিকে বলেন, ‘নবীনগরের মতো এই ছোট্ট শান্তির শহরে প্রকাশ্যে অস্ত্রধারীরা চাঁদার জন্য গুলি করতে পারে, সেটি আমরা এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না। তবে এ ঘটনার মূল নায়ক (প্রধান আসামি) এখনও গ্রেপ্তার না হওয়ায় বাজারের ব্যবসায়ীরা এখনো চরম আতঙ্কে রয়েছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা এ প্রতিনিধিকে বলেন, ‘প্রকাশ্যে ব্যবসায়ীকে চাঁদাবাজদের গুলি, একের পর এক সংঘটিত খুন ও ধর্ষণের ঘটনার সঙ্গে জড়িত মূল অপরাধীরা গ্রেপ্তার না হওয়া সত্যিই দুঃখজনক। তবে অতীতে এখানে বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি। শুনেছি, বেশির ভাগ ঘটনারই মোটা অংকের টাকায় গ্রাম্য সর্দারদের মধ্যস্থতায় মিমাংসা হয়ে যায়। যার কারণে অপরাধীরা এসব ঘটনা বারবারই ঘটাতে সাহস পাচ্ছে বলে আমি মনে করি।’

তিনি বলেন, অপরাধীরা প্রশাসনকে এখন আর তেমনভাবে ভয় পাচ্ছে না। তবে কি কারণে অপরাধীরা নবীনগরের প্রশাসনকে ভয় পাচ্ছে না, সেটি আগে খতিয়ে দেখে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে বলেও তিনি মত প্রকাশ করেন।

এ বিষয়ে নবীনগর সার্কেলের দায়িত্বে থাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মকবুল হোসেন গতকাল বুধবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিটি ঘটনার পরপরই পুলিশ কিন্তু কঠোর এ্যাকশানে যাচ্ছে। আলোচিত থানাকান্দির ঘটনায় এ পর্যন্ত প্রায় ১০০ ও সাহেবনগরের ঘটনায় ১০ জন আসামিসহ সব ঘটনার পরই বহু আসামিকে গ্রেপ্তার করেছি। এছাড়া যখনই ঘটনা ঘটছে, পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থাও নিচ্ছে।’

তিনি বলেন, প্রশাসনকে অপরাধীরা ভয় পাচ্ছে না, এটি মোটেও সঠিক নয়। এছাড়া প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যান্য আসামিদের ধরতে পুলিশের একাধিক টিম দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে।’ তবে এ বিষয়ে তিনি গণমাধ্যম কর্মীদেরও সার্বিক সহযোগিতা চান।

 

Please follow and like us: