করোনাভাইরাস: রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াবেন যেভাবে

চলছে করোনাভাইরাসের মহামারি। ইতালি, স্পেন ও আমেরিকার মতো উন্নত দেশ ইতোমধ্যে ভাইরাসটির করাল গ্রাসে কাবু হয়ে গেছে। হাতে গোনা কয়েকটি দেশ ছাড়া বিশ্বের প্রায় সকল দেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। বেড়ে চলেছে ভাইরাসটির সংক্রমণ জনিত মৃত্যুর সংখ্যা। সেইসঙ্গে বেড়ে চলেছে জনসাধারণের আতঙ্ক।

দুশ্চিন্তা ও অজানা আশঙ্কায় আচ্ছন্ন মানুষেরা ইমিউন সিস্টেমকে (শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা) শক্তিশালী করতে করণীয় জানতে অনলাইনে সার্চ দিয়ে যাচ্ছেন। ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করতে পারে এমন খাবার রয়েছে? কোন খাবারগুলো খেলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ শক্তি বৃদ্ধি পাবে? ভিটামিন কি সহায়ক হবে? করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে কোন সাপ্লিমেন্ট কার্যকর? রসুন খেলে করোনাভাইরাস ধ্বংস হবে? এছাড়া এ সংক্রান্ত আরো নানা প্রশ্ন তারা সার্চ করছেন।

ইমিউন সিস্টেম হচ্ছে কোষ, অঙ্গ ও কলার জটিল নেটওয়ার্ক, যা শরীরকে সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে একত্রে কাজ করে। ইমিউন সিস্টেমের ওপর কিছু বংশগত প্রভাব থাকলেও গবেষণা থেকে এটা জানা গেছে যে, আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কেমন হবে তার বেশিরভাগই নির্ভর করে অবংশগত ফ্যাক্টরের ওপর। জীবাণুর সংস্পর্শ এবং মানসিক চাপ, ঘুম, খাবার ও শরীরচর্চার মতো জীবনযাপনের ফ্যাক্টরগুলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার মাত্রা নির্ধারণ করে থাকে।

আপনি হয়তো জেনে হতাশ হবেন যে ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করা ও করোনাভাইরাস থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য গ্যারান্টি দিতে পারে এমন কোনো জাদুকরী বড়ি অথবা নির্দিষ্ট খাবার নেই। কিন্তু দুশ্চিন্তা করবেন না, ইমিউন সিস্টেমের কার্যকারিতা বাড়াতে কিছু বাস্তবসম্মত উপায় রয়েছে।

মানসিক চাপ কমান: করোনাভাইরাস নিয়ে দুশ্চিন্তার যেন শেষ নেই। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রুখতে গিয়ে জীবনযাত্রায় বিঘ্নতা ও দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি মানসিক চাপের মাত্রা বৃদ্ধি করছে। কিন্তু এটা জানা জরুরি যে, অতিরিক্ত মানসিক চাপও শ্বাসতন্ত্রীয় অসুস্থতার প্রবণতা বৃদ্ধি করে। তাই মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের টেকনিকসমূহ রপ্ত করুন, যেমন- ধ্যান, গভীর শ্বাসক্রিয়া ও প্রার্থনা। এসবকিছু ইমিউন সিস্টেমকে সবল রাখতে সহায়তা করবে।

ঘুমের অভ্যাস উন্নত করুন: সুস্থ ইমিউন সিস্টেম সংক্রমণকে তাড়াতে পারে। ঘুম-বঞ্চিত ইমিউন সিস্টেম কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে না। সুতরাং ঘুমের অভ্যাসের ওপর ফোকাস হচ্ছে ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করার অন্যতম সহজ উপায়। প্রতিরাতে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা ঘুমাতে পারলে ভালো। প্রতিদিন একই সময়ে বিছানায় যান ও একই সময়ে জেগে উঠুন। বিছানায় যাওয়ার পূর্বে স্ক্রিনের ব্যবহার, খাবার ও শরীরচর্চা পরিহার করুন। বিছানায় শুয়ে ফেসবুকের মতো সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন।

শরীরে ভিটামিন ডি নিশ্চিত করুন: ভিটামিন ডি ও ইমিউন স্বাস্থ্যের মধ্যকার যোগসূত্র সম্পর্কে নিশ্চিত হতে আরো গবেষণার দাবি রাখলেও কিছু আশাপ্রদায়ক গবেষণা ইঙ্গিত দিয়েছে যে, পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি শরীরকে শ্বাসতন্ত্রীয় অসুস্থতা দূর করতে সাহায্য করে। ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো স্কুল অব মেডিসিনের ইমার্জেন্সি মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক অদিত গিন্ডি বলেন, ‘আপনার পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি না থাকলে শরীর ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া ধ্বংসকারী অণুজীব-বিরোধী প্রোটিন উৎপাদনে ততটা কার্যকর হতে পারবে না এবং আপনি বেশি সংক্রমণ প্রবণ হয়ে পড়বেন। এসব প্রোটিন শ্বাসতন্ত্রে বিশেষভাবে সক্রিয় থাকে।’

এটা উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ যে, ইমিউন স্বাস্থ্য উন্নত করতে ভিটামিন ডি গ্রহণের ব্যাপারে ক্লিনিক্যাল রিকমেন্ডেশন নেই, যদিও হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য স্ট্যান্ডার্ড রিকমেন্ডেশন হচ্ছে প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৮০০ আইইউ (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিট)। অধিকাংশ মাল্টিভিটামিনে এই মাত্রায় ভিটামিন ডি থাকে।

স্যালমনের মতো তৈলাক্ত মাছ, দুধ ও ভিটামিন ডি ফর্টিফায়েড খাবারে ভিটামিন ডি পাবেন। প্রতিদিন কিছুসময় রোদে থাকুন, কারণ সূর্যালোকের সংস্পর্শে শরীরে ভিটামিন ডি তৈরি হয়। শরীরে ভিটামিন ডি এর মাত্রা চেক করতে একটি ব্লাড টেস্ট করতে হয়। প্রতি মিলিমিটার রক্তে ২০ ন্যানোগ্রামের কম ভিটামিন ডি মাত্রাকে ঘাটতি বিবেচনা করা হয় এবং ৩০ এর উপরে হলে সর্বোচ্চ ধরা হয়।

সারকথা হচ্ছে, আপনার ইমিউন সিস্টেম নিয়ে দুশ্চিন্তা হলে শরীরে ভিটামিন ডি মাত্রা চেক করুন এবং ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট সেবনের প্রয়োজন আছে কিনা জানতে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন। সাপ্লিমেন্টের পরিবর্তে বেশি পরিমাণে ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার খেতে পারলে সবচেয়ে ভালো হয়। এছাড়া প্রতিদিন ২০-২৫ মিনিট রোদে থাকার চেষ্টা করুন। এসময় স্কিন ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন।

সুষম খাবার খান ও শরীরচর্চা করুন: ইমিউন সিস্টেমকে সবল রাখতে প্রতিদিন স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হবে ও নিয়মিত শরীরচর্চা করতে হবে। কিন্তু কোনো ব্যক্তির ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করতে অথবা রোগ দূর করতে কোনো একক খাবার অথবা প্রাকৃতিক প্রতিষেধক নেই। দুঃখজনক বিষয় হলো, কিছু নামকরা নিউজ সাইট নিজেদের কাটতি বাড়াতে খাবার ও করোনাভাইরাস সম্পর্কিত ভুল তথ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেমন- কুসুম গরম রসুন পানি খেলেই করোনাভাইরাস ধ্বংস হবে। কিছু ওয়েব পোর্টালে বলা হয়েছে যে আদা, সাইট্রাস ফল, হলুদ, অরিগানো অয়েল ও হাড়ের সুপ খেলে শরীরে ঢুকে পড়া করোনাভাইরাস মারা যাবে। কিন্তু এ তথ্যগুলোর সপক্ষে শক্তিশালী প্রমাণ নেই। তবে কিছু ছোট গবেষণা ধারণা দিচ্ছে যে রসুন ইমিউন সিস্টেমের কার্যক্রম বাড়াতে পারে। কিছু গবেষণায় জিংক সাপ্লিমেন্ট সেবনে শ্বাসতন্ত্রীয় অসুস্থতার তীব্রতা হ্রাস পেয়েছে ও ঠান্ডার স্থায়িত্ব একদিন কমেছে। যেহেতু করোনাভাইরাসের সংক্রমণে শ্বাসতন্ত্রীয় সমস্যা সৃষ্টি হয়, তাই কিছু না কিছু উপকার পেতে জিংক সমৃদ্ধ খাবার খেতে পারেন।

মাউন্ট সিনাই ওয়েস্টের ইনফেকশন প্রিভেনশনের মেডিক্যাল ডিরেক্টর ও হসপিটাল এপিডেমিওলজিস্ট ক্রিস্টিনা উডস বলেন, অনলাইন ভিত্তিক নিউজ সাইটে আপনি দেখতে পাবেন যে অমুক অমুক খাবারে ভাইরাস নির্মূলের ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু আমি মনে করি না যে এসবের মেডিক্যাল প্রমাণ বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে। কেউ কেউ বলতে পারেন যে অমুক খাবার খাওয়ার পর আমি ভালো অনুভব করেছি। হ্যাঁ, এটা সত্য হতে পারে, কিন্তু এটাকে সমর্থন করার জন্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

সারকথা হচ্ছে, কোনো খাবার ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করতে পারে বলে মনে হলে সুষম খাবারের অংশ হিসেবে ওই খাবার খেলে সমস্যা নেই। কিন্তু সাধারণ মানুষের পরামর্শে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিহত করতে হুট করে সম্পূর্ণ অপরিচিত খাবার খেতে যাবেন না। এতে বিপদ হতে পারে। সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক ঘরে অবস্থান করলেও নিয়মিত শরীরচর্চা করতে ভুলবেন না। এছাড়া গবেষণায় নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি এমন ভিটামিন ও পুষ্টির সাপ্লিমেন্ট সেবন না করাই ভালো। আপনাকে নিশ্চিত হতে হবে যে প্রমাণিত স্বাস্থ্য পরামর্শকে অবহেলা করছেন না, যেমন- ভাইরাস জনিত অসুস্থতা থেকে সুরক্ষা পেতে ঘনঘন হাতকে জীবাণুমুক্ত করা ও মুখমণ্ডল স্পর্শ থেকে বিরত থাকা।

তথ্যসূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস

Please follow and like us: