মেট্রোরেলে : ৭ বছরে চার আবেদনে যা লিখেছিলেন মেয়র আইভী

রুদ্রবার্তা২৪.কম : গত বছর মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর প্রচেষ্টায় নারায়ণগঞ্জবাসী পেয়েছিলেন ‘কদম রসূল সেতু’। এবার তার ৭ বছরের অব্যাহত প্রচেষ্টায় গতিশীল যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম মেট্রোরেলের আওতায় এসেছে নারায়ণগঞ্জ। সব মিলিয়ে এই দু’টি কাক্সিক্ষত উন্নত সেবার জন্য নগরবাসীর প্রশংসার জোয়ারে ভাসছেন তিনি।
সূত্র বলছে, বাংলাদেশে মেট্রোরেল প্রকল্প শুরু হওয়ার খবরে ২০১২ সালেই নারায়ণগঞ্জকে মেট্রোরেলের আওতায় আনার জন্য প্রথম আবেদন করেছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী।
সূত্র জানায়, ২০১২ সালের ৫ ডিসেম্বর সর্বপ্রথম নারায়ণগঞ্জকে মেট্রোরেলের আওতায় আনার জন্য যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে একটি লিখিত আবেদন করেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। তিনি এই আবেদনে প্রস্তাবিত স্ট্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট পান (এসটিপি) এমআরটি-৬ মেট্রোলাইন নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত বর্ধিত করার দাবি জানান।
ওই আবেদনে মেয়র আইভী নারায়ণগঞ্জে মেট্রোরেলের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে লিখেছিলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ নগরীতে ১৪ লাখ লোকের বসবাস। এখান থেকে প্রতিদিন বিভিন্ন পেশার লক্ষাধিক লোক ঢাকায় যাতায়াত করে থাকেন। এছাড়াও শত শত ছাত্র-ছাত্রীকে প্রতিদিন ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু অপ্রতুল্য ও নিচুমানের বাস এবং অপর্যাপ্ত পরিমান ট্রেন সার্ভিসের কারণে যাত্রীদের গন্তব্য স্থানে পৌঁছাতে প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। একই সাথে প্রতিদিনই লক্ষাধিক লোকের মূল্যবান অপচয় ঘটে।’
আবেদনে আরও বলা হয়, ‘স্ট্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্লান (এসটিপি) এমআরটি-৬ মেট্রোরেল বাস্তবায়নের জন্য সম্পূর্ণভাবে জাইকার অর্থায়নে ও ব্যবস্থাপনায় সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কাজ ইতোমধ্যে সমাপ্ত হয়েছে। এমআরটি-৬ প্রকল্পটি উত্তরা ৩য় ফেইজ থেকে পল্লবী হয়ে টিএসসি হতে দোয়েল চত্বর হয়ে তোপখানা রোড দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত প্রস্তাব করা হয়েছে যা সরকার কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে। শিল্প ও বন্দর নগরী নারায়ণগঞ্জের গুরুত্ব অনুধাবন করে জনদুর্ভোগ লাঘব ও যোগাযোগ ব্যবস্থার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে এমআরটি-৬ মেট্রো লাইন নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত বর্ধিত করার জন্য অনুরোধ করা হলো।’
তবে, ২০১২ সালের আবেদনে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সাড়া না দেওয়াতে ২০১৬ সালে সিটি করপোরেশনের মেয়র আইভীর পুনরায় মেট্রোরেল স্থাপনের অনুমতি চেয়ে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগে লিখিত আবেদন জানিয়েছিলেন। আবেদনটি মেয়রের পক্ষে করেছিলেন সেসময়কার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. মাহমুদুর রহমান হাবিব।
ওই আবেদনে বলা হয়েছিলো, ‘নগর যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এলআরটি লিমিটেড পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশীপ (পিপিপি) পদ্ধতিতে লাইট র‌্যাপিড ট্রান্সিট (এলআরটি) গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু করার জন্য সিটি করপোরেশনে প্রস্তাব দাখিল করেন। বর্ণিত প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ৮শ ৫ কোটি টাকা, যা বর্ণিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নির্বাহ করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এ অঞ্চলের গণপরিবহন ব্যবস্থা সহ পরিবহন অবকাঠামো উন্নত হবে। এ বিষয়ে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশীপ (পিপিপি) পদ্ধতিতে নারায়ণগঞ্জ নগরীতে এলআরটি স্থাপনের লক্ষ্যে সিটি করপোরেশনের ৩৭তম সাধারণ সভায় প্রকল্পটির প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শুরু করা জন্য সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তাই পিপিটি পদ্ধতিতে নারায়ণগঞ্জ নগরীতে এলআরটি স্থাপনের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো।’
তবে, এতেও কোনো সাড়া না পেয়ে পরবর্তীতে ২০১৭ সালের জুনে মেয়র আইভীর নির্দেশে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদুর রহমান হাবিব স্থানীয় সরকার বিভাগের উদ্দেশ্যে এলআরটি স্থাপনে অনুমতি চেয়ে আবারও লিখিত আবেদন করেন।
সূত্র জানায়, এরপরও দমে যায়নি মেয়র আইভী। তিনি অব্যাহত ভাবে সরকারি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে নারায়ণগঞ্জকে মেট্রোরেলের আওতায় আনার জন্য যোগাযোগ রক্ষা করে যাচ্ছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের ১ অক্টোবর তিনি মট্রোরেলের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের সংযোগ স্থাপনের জন্য বাংলাদেশ সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী বরাবর আবেদন করেন।
তার ওই আবেদনের প্রেক্ষিতে ২৪ নভেম্বর এ নিয়ে ডিটিসিএ’র বোর্ড সভায় আলোচনা হয়। পরে এমআরটি লাইন দু’টি নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত বর্ধিত করে সমন্বিত পরিবহন অবকাঠামোর আওতায় আনার সিদ্ধান্ত গৃহতি হয় সভাতে। ফলে, নারাগঞ্জকে মেট্রোরেলের আওতায় নেওয়া হয়েছে।
এই আবেদনে মেয়র আইভী উল্লেখ করেন, ‘ডিটিসিএ কর্তৃক সম্প্রতি ঢাকা মহানগরীর জন্য সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (আরএসটিপি) ২০১৬-২০৩৫ প্রণয়ন করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ নগর ডিটিসিএ’র আওতাভুক্ত। আরএসটিপিতে পাঁচটি এমআরটি লাইন ও ২১টি মাল্টিমডেল টার্মিনাল হাব নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। যার মধ্যে এমআরটি লাইন-২ চট্টগ্রাম রোডে শেষ হবে এবং এমআরটি লাইন ৪ বিদ্যমান রেললাইন নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত প্রস্তাব করা হয়েছে।
এছাড়াও নারায়ণগঞ্জ নগরীতে একটি মাল্টিমডেল টার্মিনাল হাব নির্মাণের প্রস্তাব করা হয় ওই আবেদনে। লাইন দু’টি আরএসটিপিতে নারায়ণগঞ্জ নগরীতে প্রস্তাবিত মাল্টিমডেল টার্মিনালের সঙ্গে সংযুক্ত করে ঢাকা নগরীর সঙ্গে সমন্বিত একটি পরিবহন অবকাঠামো নির্মাণ করা যেতে পারে। ফলে নারায়ণগঞ্জ আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে উন্নত ও পরিবেশবান্ধব পরিবহন সেবা প্রদান করা সম্ভব হবে।’
এ বিষয়ে মেয়র আইভী বলেন, “সভায় এ নিয়ে একটি সিদ্ধান্ত হয়েছে। আমরা কাজটিকে স্বাগত জানাচ্ছি। যাতে অতি দ্রুত এটি বাস্তবায়ন হয়।”
সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, “নারায়ণগঞ্জ শহরে উন্নয়নে সুষ্ঠু ও সমন্বিত পরিকল্পনার জন্য একটি বিস্তৃত পরিবহন পরিকল্পনা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ডিটিসিএ এটি প্রস্তুত করবে।”
গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, “উদ্যোগটি ভালো। নারায়ণগঞ্জ থেকে অনেক কমিউটার ট্রেন ঢাকায় আসতে চায়। কিন্তু এখন যেগুলো আসছে সেগুলো দ্রুত নয়। অনেক ক্রসিং পার হয়ে আসতে হয়। নারায়ণগঞ্জ থেকে যদি মেট্রো রেলের মাধ্যমে আসা যায় তাহলে সময় বাঁচবে।”
তিনি আরও বলেন, “অফিসে সময়মতো পৌঁছানো নির্ভর করে রাস্তার ওপর। অনেকে নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থান থেকে ট্রেনে করে কমলাপুরে এসে সেখান থেকে বাসে করে গন্তব্যে পৌঁছুতে হয়। মেট্রো চালু হলে মানুষ গন্তব্যে সহজ ও দ্রুত সময়ে পৌঁছে যেতে পারবে। এতে ঢাকার মানুষ অফিস শেষে পাশ্ববর্তী শহরে চলে যেতে পারবেন।”

Please follow and like us: